করোনা প্রতিরোধে টি-সেল

করোনা প্রতিরোধে টি-সেল

অনলাইন ডেস্ক:

টি-সেল, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সম্মুখসারির যোদ্ধার নাম। বিভিন্ন ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এই বিশেষ কোষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু সার্স-কোভ-২ বা নতুন করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এর ভূমিকাটি এত দিন অস্পষ্ট ছিল। এবার সেই অস্পষ্টতা কিছুটা হলেও দূর হলো।

গবেষণা পত্রিকা সায়েন্স–এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্প্রতি পরিচালিত দুটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, করোনায় সংক্রমিত ব্যক্তির শরীরে টি সেলের উৎপাদন বেড়ে যায়, যা তাদের কোভিড-১৯ রোগ থেকে সেরে উঠতে সহায়তা করে। শুধু তা-ই নয়, গবেষণায় দেখা গেছে, আগে করোনাভাইরাস পরিবারের কোনো সদস্য দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে—এমন কিছু লোকের শরীরে ভাইরাসটি কোনো সংক্রমণই ঘটাতে পারে না।

এ বিষয়ে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অ্যাঙ্গেলা রাসমুসেন বলেন, ‘এটি খুবই উৎসাহব্যঞ্জক তথ্য। তবে গবেষকেরা এটা নিশ্চিত করতে পারেননি যে, সার্স-কোভ-২ ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে সেরে ওঠা ব্যক্তি ভবিষ্যতে এই ভাইরাসটি থেকে সুরক্ষিত থাকবে কিনা। কিন্তু উভয় গবেষণাতেই ভাইরাসটি সংক্রমণ কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে টি-সেলের শক্তিশালী ভূমিকার কথা উঠে এসেছে। এটি দীর্ঘ মেয়াদে ভাইরাসটির বিরুদ্ধে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হওয়ার পূর্বলক্ষণ বলা যায়। এই গবেষণা ফলাফল ভ্যাকসিন তৈরিতে নিযুক্ত গবেষকদের জন্য বিশেষভাবে সহায়ক হবে।’

১৪ মে সেল জার্নালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের গবেষকেরা বর্তমানে শতাধিক ভ্যাকসিন তৈরির গবেষণায় নিয়োজিত। এই গবেষণায় এখন পর্যন্ত মূল মনোযোগটি রয়েছে অ্যান্টিবডিতে। এই বিশেষ প্রোটিনগুলো বি-সেল দ্বারা তৈরি, যা ভাইরাসটির (এ ক্ষেত্রে সার্স-কোভ-২) গায়ের সঙ্গে লেগে থেকে একে শরীরের কোষে প্রবেশে বাধা দেয়। বিপরীতে টি-সেল সংক্রমণ ঠেকায় দুভাবে। বি-সেলসহ রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার অন্য গুরুত্বপূর্ণ কোষগুলোকে সক্রিয় হতে সহায়তা করে টি-সেল। এই টি-সেলকে বলা যেতে পারে হেলপার টি-সেল। দ্বিতীয় ভূমিকাটি হচ্ছে সরাসরি নিজের সক্রিয় হওয়ার। এই টি-সেল হচ্ছে কিলার টি-সেল, যা সংক্রমিত কোষগুলো ধ্বংস করে। এই টি-সেল কত দ্রুত সাড়া দিচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে, রোগটি কত গুরুতর পর্যায়ে যাবে।

ক্যালিফোর্নিয়ার অলাভজনক গবেষণা প্রতিষ্ঠান লা জোলা ইনস্টিটিউট ফর ইমিউনোলজির একদল গবেষক সম্প্রতি কোভিড-১৯ থেকে সেরে ওঠা ১০ জন রোগীর শরীর থেকে সক্রিয় থাকা প্রহরী কোষের নমুনা সংগ্রহ করেন। গবেষক শেন ক্রোটি ও আলেসান্দ্রো সেতের নেতৃত্বে হওয়া এ গবেষণায় বায়োইনফরমেটিকস কৌশল কাজে লাগিয়ে গবেষকেরা অনুসন্ধান করেন যে, কোন ভাইরাল প্রোটিনের কারণে টি-সেল সবচেয়ে বেশি সাড়া দেয়।

এতে দেখা যায়, সব রোগীর শরীরেই ছিল হেলপার টি-সেলের অস্তিত্ব, যারা সার্স-কোভ-২-এর স্পাইক প্রোটিনকে শনাক্ত করতে পারে। এই স্পাইকগুলোর মাধ্যমেই ভাইরাসটি মানুষের শরীরের কোষে প্রবেশ করে। একই সঙ্গে এরা অন্য সহায়ক টি-সেলগুলোকে আশ্রয় দেয়, যারা ভাইরাসটির অন্য প্রোটিনগুলোকে আক্রমণ করে। পরীক্ষাধীন রোগীদের ৭০ শতাংশের শরীরেই কিলার টি-সেলের অস্তিত্ব পেয়েছেন গবেষকেরা। তাঁরা বলছেন, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভাইরাসটিকে চিনতে পারছে এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থাও নিচ্ছে।

সাম্প্রতিক এই গবেষণা জার্মানির বার্লিনভিত্তিক শারিটে ইউনিভার্সিটি হসপিটালের ইমিউনোলজিস্ট আন্দ্রে থিয়েলের নেতৃত্বে হওয়া গবেষণার তথ্যকে সমর্থন করছে। ২২ এপ্রিল প্রকাশিত ওই গবেষণার প্রতিবেদনে জানানো হয়, পরীক্ষাধীন ১৮ রোগীর মধ্যে ১৫ জনের শরীরে হেলপার টি-সেলের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। ওই একই গবেষণায় সংক্রমণের শিকার হয়নি এমন ৬৮ ব্যক্তিকে পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, তাদের ৩৪ শতাংশের শরীরে এই হেলপার টি-সেলের অস্তিত্ব রয়েছে, যা সার্স-কোভ-২ ভাইরাসকে চিনতে পারে। একই ধরনের ফল পেয়েছে লা জোলার গবেষক দল। ২০১৫ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে সংগৃহীত রক্তের নমুনায় তারা এই বিশেষ টি-সেলের অস্তিত্ব পেয়েছে।

গবেষকেরা বলছেন, যে চার ধরনের করোনাভাইরাস এর আগে মানুষকে আক্রান্ত করেছে, সেগুলোরই কোনো একটাতে হয়তো ওই ব্যক্তিরা আক্রান্ত হয়ে থাকবেন। সে সময় নিশ্চয় তাদের শরীরে এই বিশেষ টি-সেল তৈরি হয়ে থাকবে।

এই বিষয়ে আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমিউনোলজিস্ট স্টিভেন ভারগা বলছেন, ‘এই গবেষণা আমাদের বলছে যে, সাধারণ ঠান্ডাজনিত রোগের কারণ যে ভাইরাসগুলো, সেগুলোতে কম-বেশি সবাই আক্রান্ত হওয়ায় কিছু লোকের শরীরে এ ধরনের ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ব্যবস্থার একটা অবশেষ রয়ে গেছে। আর এই ব্যবস্থাই বর্তমানে ভাইরাসটির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তাদের সহায়তা করছে।’

তবে গবেষকেরা বলছেন, এই গবেষণা কোনোভাবেই এটি বলছে না যে, ঠান্ডার সমস্যায় ভোগা বা ওই সংশ্লিষ্ট ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া ব্যক্তিরা কোভিড-১৯ থেকে সুরক্ষিত।

-এফকে

Print Friendly, PDF & Email
FacebookTwitter