যাতনাময় প্রবাস জীবন

মিলি সুলতানা, কুইন্স, নিউইয়র্কে থেকেঃ

সামার সিজনে আমেরিকায় চেরি ফুলের সাম্রাজ্য দেখার মত। হাজার জাতের ফুল। এত রূপ এত বর্ণ কিন্তু গন্ধহীন। এটা আল্লাহতায়ালার বিধান মনে হচ্ছে। সবাই সবদিকে সম্পূর্ন নয়।

একটা না একটা দিকে তার কমতি থাকেই। মানুষ হোক আর প্রকৃতির বেলায় হোক। আমার এক পরিচিতার একমাত্র সন্তান। কষ্টের কথা হচ্ছে বাচ্চাটা বিকলাঙ্গ বাচ্চাটা। মা ফুল শিফট চাকরি করে।বাচ্চাকে বেবিসিটারে রেখে অফিসে যায়। ওই বাচ্চাটা তার পায়ের আঙুলের ফাঁকে পেন্সিল জাপটে ধরে একদিন তার মায়ের উদ্দেশ্যে একটা নোট লিখলো, “মা আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ। কিন্তু গডের উপর আমার অভিমান আছে। আমাকে এমন অদ্ভুত প্রাণী বানিয়ে কেন দুনিয়ায় পাঠালো? বেবিসিটারে লেডি আমাকে নিয়ে ফান করে। হাসাহাসি করে। মা আমি কেন সারাদিন তোমার কাছে থাকতে পারিনা?”

সেই মা আর স্থির থাকতে পারলো না সন্তানের নোট পড়ার পর। রাতভর কান্নাকাটি করে পরদিন চাকরি থেকে কুইট করলো। আসলে মা’রাই পৃথিবীতে সন্তানের জন্য বেশি স্যাক্রিফাইস করে।

এখন সেপ্টেম্বর চলছে। চেরিফুলের দাপট ঝিমিয়ে গেছে। একটু একটু করে শীত ফুঁ দিয়ে মশকরা করছে। কয়েকদিন আগে বাস স্টপেজের বেঞ্চিতে আরাম করে বসে ফোনালাপ করছিলাম। পঞ্চাশ ষাট গজ দূরে দেখলাম লাল রঙের ঝকঝকে একটি অডিসি গাড়ি একটি চাইনিজ দোকানের বাইরের পিলারে বিকট শব্দে ধাক্কা খেয়ে ডান সাইড ম্যাচাকোচা হয়ে গেল। মানুষ ছুটোছুটি করছে, যে যে অবস্থায় ছিল ঠিক সেই অবস্থায় দৌড়ে গেল অ্যাকসিডেন্ট করা লাল অডিসির দিকে। দেখলাম গাড়ির জানালা দিয়ে হাতভরা চুড়ির একটি উপমহাদেশীয় হাত। উপমহাদেশীয় হাত বলতে আমি বাংলাদেশ ভারত ও পাকিস্তানকে বুঝিয়েছি। কারণ এই তিন দেশের নববিবাহিতা মেয়েরা হাতভরা চুড়ি পরে থাকে। আমার বুকটা তড়াক করে লাফিয়ে উঠলো। আমি ফোন ডিসকানেক্ট করে দৌড় লাগালাম। দেখলাম যে, আমার অনুমান মিথ্যে ছিল না।

জরি চুমকি কুন্দনের কাজ করা লাল রঙের গরজিয়াস ড্রেস পরিহিতা গুজরাটি যুবতী। মহিলা বাম হাতের কনুই দিয়ে রক্ত পড়ছে। অনেকে রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে নিজেদের গাড়ি থেকে নেমে এলো সাহায্য করতে। কয়েকজন তো 911 এ কল করে দিল। আমি দেখলাম মহিলার চেহারায় ভীতির ছাপ স্পষ্ট। খুব ঘামছিল। আমি ব্যাগ থেকে টিস্যু বের করে তার রক্ত মুছে দিলাম। মহিলার নাম রাধিকা। নতুন বিয়ে হয়েছে। নিউইয়র্কে এসেছে তিনমাস হল। কিন্তু স্বামী শাশুড়ি ননদের ভয়ে ভীষণভাবে তটস্থ। ড্রাইভিং লাইসেন্স পেয়েছে পনেরো দিন হয়নি। এরই মধ্যে দামী গাড়িটা অ্যাকসিডেন্ট করে বসলো। কিভাবে সে স্বামী শাশুড়ি ননদের তিরস্কার সামাল দেবে? টুকটাক কথা বলছিলাম রাধিকার সাথে। পুলিশ এসে পড়লো, “Mam are you okay? Let’s go to Hospital !” কিন্তু রাধিকার ভীতিকর চেহারা দেখে খুব মায়া হল। ততক্ষণে তার স্বামী এসে পড়ল। পথচারী ও পুলিশের সামনে স্ত্রীকে রূঢ় ভাষায় আচ্ছামত বকা দিলো। গুজরাটি ভাষার অস্ত্র দিয়ে স্ত্রীকে আচ্ছামতো ধোলাই দিলো। আমার মনে হল মাথায় পাগড়ি বাঁধা ওই বাল্লে বাল্লে গুজরাটি লোকটি তার বেটাগিরি ফলাতে চাচ্ছে।

রাধিকার চোখ দিয়ে পানি পড়ছিলো। স্থান কাল পাত্র ভুলে গিয়ে স্বামীকে অনুরোধ করছিলো, বাসায় যেন কেউ তাকে গালাগালি না করে। বেটা আরও দুই ডিগ্রী এগিয়ে, “তুমি যে কান্ড ঘটিয়েছো তোমাকে নান্নাসা মুন্নাসার মত কোলে বসিয়ে চুমু খাবে?” এমন চামার পাষন্ড পুরুষ আমি কম দেখেছি। খুব রাগ হল। কিন্তু রাগ কন্ট্রোল করলাম উল্টো গুনে। উল্টো গুনলে রাগ কমে, হুমায়ুন আহমেদের লেখা থেকে জেনেছি। এপ্লাই করে উপকারও পেয়েছি। পুলিশকে বিদায় করে দিলো রাধিকা। রাধিকার স্বামীর পাগড়ি থেকে পচা পচা গন্ধ বের হচ্ছিলো। পাগড়িতে ঢেকে রাখা চুলের বিচ্ছিরি গন্ধ রাধিকারা কিভাবে সহ্য করে ভাবলাম আমি। স্বামী সংসারের প্রতি এতবেশি ডেডিকেটেড হয়েও লক্ষ লক্ষ রাধিকা তাদের কাজের স্বীকৃতি পায়না।

এসএম

One Comment on “যাতনাময় প্রবাস জীবন”

  1. সিং দের মাথায় ঝাপটি চুল বাঁধানো ঘামের গন্ধে তাদের সামনে থাকা যায়না এই প্রথম শুনলাম।😂😂

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *