ত্রাণ কর্মীদের চলে যেতে বললেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী!

কূটনৈতিক সংবাদঃ

বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করা ত্রাণকর্মীসহ বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের মিয়ানমারে যেতে বললেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন।

জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ তিন সংস্থার প্রধানদের সঙ্গে যৌথ বৈঠকের পর মন্ত্রী সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘আমি তাদের বলেছি আপনাদের এখানে কাজ নাই, মিয়ানমারে যান। আমি বেশ শক্তভাবে বলেছি। আপনারা ওখানে বেশি জোর দেন, এখানে না। আমি জিজ্ঞাসা করেছি আপনারা কতবার মিয়ানমার গেছেন? সেখানে আপনাদের কত লোক কাজ করে? এখানে তো হাজারেরও বেশি লোক কাজ করে, ওখানে বেশি কাজ করেন, আপনারা এখান থেকে বিদায় হোন।’ মন্ত্রী কোন রকম রাখঢাক না করে একাধিকবার বলেন, ‘আমি তাদের বলেছি আপনারা মিয়ানমার যান, এখানে আপনাদের কোন কাজ নেই। এখানে আমরা ঠিক আছি। যা যা করার তা করছি, করতেছি। আপনারা মিয়ানমারকে কনভিন্স করেন।

যাতে তারা তাদের লোক নিয়ে যায় এবং ওখানে একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে কাজ করেন।’

বৃহস্পতিবার দিনের শুরুতে সফররত জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর-এর প্রধান (হাইকমিশনার) ফিলিপো গ্রাান্ডি, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম মহাপরিচালক অ্যান্টনিও ভিটোরিনো এবং জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল মার্ক লোকক পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে যান।

মন্ত্রীর দপ্তর সংলগ্ন অতিথি কক্ষে অনুষ্ঠিত দীর্ঘ বৈঠক শেষে গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেন মন্ত্রী। ১৩ মিনিটের ওই ব্রিফিংয়ে মন্ত্রী উপস্থিত সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নেরও জবাব দেন। এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান চায়। কোনো রকম যুদ্ধে জড়াতে চায় না।

সমস্যা মিয়ানমার তৈরি করেছে, সমাধান তাদেরই করতে হবে। তিনি বলেন, আপনি শক্ত অবস্থানের কথা বলছেন, আপনি কি যুদ্ধ করতে যাবেন? না, আমরা যুদ্ধ করবো না। আমাকে পাওয়ারফুলদের কেউ কেউ পরামর্শ দিচ্ছেন, যদি আমরা চাই তাহলে তারা সেখানে কিছু একটা মহড়া করে দেখাবেন। এই ‘পাওয়ারফুল’ কে? ব্যক্তি না দেশ? জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, দেশ। ব্যক্তি না। আমরা খুব একটা পাত্তা দেইনি। তারা বলেছেন তোমরা চাইলে আমরা তোমাদের হয়ে ক্ষমতা দেখাতে পারি। আমরা বলেছি না। কারণ আমরা শান্তিপূর্ণভাবে এ সমস্যার সমাধান চাই। এ সময় মন্ত্রী বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, আমি আশাবাদী, মিয়ানমার এর আগে লোক নিয়ে গেছে। এবারও নেবে। তারা নেবে না এটা কখনও বলেনি। মিয়ানমারের মন্ত্রী এখানে এসেছেন, তিনি বলেছেন তারা তাদের লোক নিতে চান। আমরা তার কথায় বিশ্বাস রাখছি। তবে তাদের বলেছি, কয়েক জন নয়, লোক দেখানোর জন্য নয়। কয়েক লাখ নিলে আপত্তি নাই।

লোক মরলে দায় আপনাদের, বাংলাদেশের না: পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেন সাফ জানিয়ে দিলেন, সরকার জোর করে কাউকে ভাষানচরে পাঠাবে না। তবে ভাষানচরে রোহিঙ্গাদের স্থানান্তর করতে না পারলে এবং আসন্ন বর্ষায় কক্সবাজারে ভূমিধসে কোনো সমস্যা হলে তার দায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বহন করতে হবে।

মন্ত্রী বলেন, আবহাওয়া অফিস বলছে, এবার বেশি বৃষ্টিপাত হবে। এতে পাহাড়ধস হলে মানুষ মারা যাবে। রোহিঙ্গা ক্যাম্প এলাকায় কেউ মারা গেলে বাংলাদেশের কোনো দায় থাকবে না। যারা বাঁধা দিচ্ছে, তারাই এ মৃত্যুর জন্য দায়ী থাকবেন। এ সময় মন্ত্রী আরও বলেন, ভাষানচরে রোহিঙ্গারা গেলে অর্থনৈতিকভাবে কাজ করার সুবিধা পাবে।

মাছ ধরতে পারবে, গরু পালন করতে পারবে। ভাসানচরে আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে রোহিঙ্গাদের জন্য বাড়িঘর, আশ্রয় কেন্দ্র এবং অন্যান্য সুবিধাদি তৈরি করেছে সরকার। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া থমকে যাওয়ায় সরকার প্রায় ১ লাখ রোহিঙ্গাকে আপাতত কক্সবাজারের ক্যাম্প থেকে ভাষানচরে পূনর্বাসন করতে চায়। কিন্তু জাতিসংঘসহ পশ্চিমা দুনিয়া, যারা রোহিঙ্গা সংকটের সূচনা থেকে বাংলাদেশের পাশে আছে, তাদের এতে এখনও সায় নেই। এ অবস্থায় আগামী বর্ষায় কক্সবাজারে অবস্থানরত রোহিঙ্গারা বিভিন্ন রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হতে পারে এবং সেখানে প্রাণহানীর ঘটনা ঘটার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন সরকার।

সফররত জাতিসংঘের ৩ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, যারা রোহিঙ্গা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় এই মুহুর্তে ঢাকায় রয়েছে।শুক্রবার তারা কক্সবাজার যাচ্ছেন। সেখানকার পরিস্থিতি সরজমিনে দেখবেন। বর্ষা মৌসুমে রোহিঙ্গাদের দুর্ভোগ কমানোর বিষয়ে তারা মন্ত্রীসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা করেছেন। সরকারের তরফেও এ নিয়ে ইতিবাচক অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর আগের দিনে প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপিও দুর্ভোগ লাঘবে লাখো রোহিঙ্গাকে ভাষানচরে অস্থায়ীভাবে স্থানান্তরে সরকারের আন্তরিক ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন।

পররাষ্ট্র মন্ত্রী গতকাল তার বৈঠকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের বলেছেন, রোহিঙ্গারা কক্সবাজারে ঝামেলা তৈরি করছে। স্থানীয় জনগণ খুব আপসেট যে এরা দিনে দিনে ঝামেলার সৃষ্টি করছে। মন্ত্রী বলেন, আমরা তাদের বলেছি ওদের সংখ্যা এত যে তারা আমাদের বন-জঙ্গল সব উজাড় করে দিচ্ছে।

চাপ বাড়ানোর আহ্বান মন্ত্রীর: রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসনে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সহায়তা চেয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাতিসংঘের তিন সংস্থার প্রধানকে বলেন, এতবড় সংস্থার প্রধান আপনারা। আপনারা চাইলে বিশ্বব্যাপী জনমত তৈরি করতে পারেন। মন্ত্রী বলেন, আমার ধারণা জনমত তৈরি করতে পারলে সবচেয়ে বড় অত্যাচারী শাসকেরও পতন হয়।

-ডিকে

Print Friendly, PDF & Email